বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট

সকল প্রশংসা মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি সবকিছুর খালেক, মালেক এবং নিয়ন্ত্রক। তিনি একক, অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। তাঁরই ইবাদত করার জন্য আমরা আদিষ্ট। অসংখ্য সালাত ও সালামের হাদিয়া পেশ করছি মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নুরানী পাক দরবারে, যিনি সমস্ত বিশ্বের জন্য রহমত হয়ে দুনিয়ার তাশরীফ এনেছেন। স্মরণ করছি আম্বিয়ায়ে কেরাম আলায়হিমুস সালাম, সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বায়তে রসূল, তাবেঈন, তাব ই তাবেঈন, শােহাদায়ে কেরাম, আউলিয়ায়ে ইবাম, ওলামায়ে কেরাম, পীর-মাশাইখ এবং ইসলামের ওই বীর-মুজাহিদদের, যাদের সংগ্রামী ত্যাগের বিনিময়ে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটেছে বিশ্বব্যাপী।

মহান আল্লাহ মানবজাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সুপথে পরিচালনার জন্য প্রতিটি যুগে পাঠিয়েছেন অসাধারণ নির্ভুল জ্ঞানসম্পন্ন নিষ্কলুষ নবী ও রসূল আলায়হিমুস সালামকে। অবতীর্ণ করেছেন মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের সর্ব বিষয়ের পূর্ণ বিবরণ সম্বলিত আসমানী কিতাব ও ঐশী বিধানাবলী । ঘােষণা করেছেন তাঁদের প্রতি প্রকৃত ভালবাসা ও বিধানাবলী অনুসরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে উভয় জগতের সাফল্য ও চিরন্তন শান্তি। পক্ষান্তরে, তাদের প্রতি অবাধ্যতা ও অবজ্ঞাই ইহকাল ও পরকালে চরম লাঞ্ছনা ও ভয়াবহ শাস্তি ভােগের কারণ।

নবীগণের আগমনের ধারা সমাপ্ত হয়েছে শেষ নবী হুযূর মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর শুভাগমনের মাধ্যমে। আর তাঁরই উপর অবতীর্ণ হয়েছে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান- পবিত্র কোরআন মজীদ। আমাদের নবীর পর যেমন আর কোন নবী ও রসূল প্রেরিত হবে না, তেমনি অন্য কোন আসমানী কিতাবও অবতীর্ণ হবে না। কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর একমাত্র মনােনীত ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। আমাদের নবী করীমের পবিত্র জীবনে রয়েছে সুন্দরতম আদর্শ। এ আদর্শই সবার জন্য একমাত্র অনুকরণীয়।

ইসলাম শান্তির ধর্ম ও সাম্যের প্রতীক, প্রকৃত অর্থে স্রষ্টার নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের দলীল। আল্লাহর পাক কালাম বিশ্ববাসীর সকল সমস্যার চিরস্থায়ী, নিশ্চিত ও নির্ভুল সমাধানের মূল উৎস। সুন্নাত ই রসূল, ইজমা ও কিয়াস হচ্ছে ইসলামের আরাে তিনটি অনুকরণীয় দলীল। আল্লাহর মনােনীত পরিপূর্ণ ধর্ম হল ইসলাম । ইসলাম জগতের বুকে মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের উদার ভাবধারাকে করেছে প্রতিষ্ঠিত। তা সত্ত্বেও ইসলামী দুনিয়া পারস্পরিক বিভক্তি এড়িয়ে যেতে পারে নি। কারণ মুসলমানদের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিভিন্ন ভন্ত মতবাদের। সেগুলাে সর্বদা ইসলামী ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। এর অবসান ঘটিয়ে ইসলামের প্রকৃত আদর্শকে আঁকড়ে ধরলেই এ বিভক্তির পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। তাদের এ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সর্বযুগে আইম্মা-ই মুজতাহেদীন, আউলিয়ায়ে ইসলাম ও প্রকৃত ওলামায়ে কেরাম তাঁদের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও দক্ষ নেতৃত্ব, বাগিতা ও ক্ষুরধার লেখনী ইত্যাদির মাধ্যমে রুখে দাড়িয়েছেন। উক্ত ভ্রান্ত মতবাদীরা এদেশেও ইসলামের নামে বিভিন্ন সরলপ্রাণ জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। যার ফলে মুসলমানরা আজ ঈমান এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বকীয়তা রক্ষায় ইতিহাসের যে কোন সময়ের চেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীর প্রথম সংবিধান হিসেবে তাঁর রচিত ‘মদীনা সনদ’র মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠরা দ্বার উন্মোচন করেছিলেন এবং বিশ্বের সর্বাধিক কল্যাণ রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন। সেই মদীনা সনদকে উপেক্ষা করে মানুষের সীমাবদ্ধ চিন্তা-চেতনা প্রসূত ধ্যান ধারণা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পৃথিবীতে মানুষে মানুষে ব্যাপকতর বৈরীতা ও সংঘাতের জন্ম নিয়েছে। আর যারা ইসলামের প্রকৃত আদর্শকে বাদ দিয়ে নিছক ইসলামের নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে এগিয়ে গেছে তারাও পরবর্তীতে ইসলামী রাষ্ট্রের অনিবার্য সুফল প্রদর্শন করতে পারেনি।

খােদাপ্রাপ্তিই প্রত্যেক মুসলমানের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্যার্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রেম। আর এ রসূল-প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে মানব ও সমাজের কল্যাণ সাধন করা। আজকে মুসলিম জাতি বিভিন্নভাবে বিপর্যস্ত। ইহুদী, খ্রিস্টান ও ব্রাহ্মণ্যবাদী অপ-শক্তি মুসলিম জাতিকে তাদের ক্রীড়ানকে পরিণত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি প্রকৃত ভালবাসা, আকীদার বিশুদ্ধতা ও আদর্শিক দৃঢ়তা ক্রমশ হারিয়ে ফেলায় মুসলিম মিল্লাত তার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছুতে বারংবার বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। আল্লাহ ও রসূলের প্রতি যে বিশ্বাস মুসলিম জাতিকে বীরের জাতিতে পরিণত করেছিল তা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে মুসলিম জাতি তার হৃত গৌরব ফিরে পাবে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়- ইসলামের একমাত্র সঠিক রূপরেখা হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জমাতের মতাদর্শ। এদেশে শান্তিপূর্ণ ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের জন্য এ আদর্শ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের রাজনৈতিক অভিযাত্রা।

স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত এদশের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ১৯৭১ সালের মহা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্ব-মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যূদয় ঘটে। স্বাধীনতার প্রায় চার দশকেও ভাগ্য বিড়ম্বিত জাতির সার্বিক মুক্তি আসেনি। এদেশের রাজনীতি চলেছে ধ্বংস ও দুর্ব্তায়নের পথে, অবিশ্বাস, মাস্তানী ও সন্ত্রাসের পথে। ক্ষমতা সব সময় দূর্নীতির সহযাত্রী ছিল, ছিল স্বজনপ্রীতি ও দলগত প্রতিযােগিতার হাতিয়ার। আন্দোলনের নামে রাজপথ ছিল প্রতিহিংসার নীরব সাক্ষী। গত ৩৫ বছরে ক্ষমতা কখনো জনগণের পক্ষে কথা বলেনি । এদেশের গণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সম্ভবপর হয়নি। এ ধরনের রাজনীতি যেন জনগণের সাথে প্রতারণার এক নির্মম ফাঁদ। যে শান্তি, মুক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা, এ সমস্ত অবস্থার কারণে ওই লক্ষা অর্জিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, কোরআন-সুন্নাহর আলােকে এদেশে সুন্নী মতাদর্শ ভিত্তিক ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের একমাত্র লক্ষ্য। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা-ই কেরাম, আহলে বায়তে রসূল, শােহাদায়ে কেরাম, আইম্মায়ে মুজতাহেদীন, পীর-মাশাইখ, আল্লাহর ওলীগণ ও সত্যিকার ওলামায়ে কেরামের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের কর্মীদের এই মিশন। আল্লাহ ও তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্য দিয়ে এদেশের সর্বস্তরে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের আন্দোলনকে বেগবান করার দৃঢ় প্রত্যয়ে এ গঠনতন্ত্র প্রণীত হল।